উত্তর-পূর্ব ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে প্রায় দেড় হাজার মাইল দূরত্ব পাড়ি দিয়ে পড়াশোনার জন্য আসা দুই ভাই আঞ্জেল চাকমা ও মাইকেল চাকমা ৯ ডিসেম্বর একটি বাজারে গিয়েছিলেন। সেখানে একদল লোক তাদের সামনে এসে দাঁড়ায় এবং বর্ণবাদী গালাগালি করে বলে অভিযোগ করেন তাদের বাবা তরুণ চাকমা।
দুই ভাই এর প্রতিবাদ করলে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, মাইকেল চাকমার মাথায় ধাতব ব্রেসলেট দিয়ে আঘাত করা হয় এবং আঞ্জেল চাকমাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। মাইকেল সুস্থ হয়ে উঠলেও আঞ্জেল ১৭ দিন পর হাসপাতালে মারা যান।এ ঘটনায় উত্তরাখণ্ড রাজ্যের পুলিশ (যার রাজধানী দেরাদুন) পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে পুলিশ দাবি করেছে, এই হামলাটি বর্ণবাদী উদ্দেশ্যে করা হয়নি, যা চাকমা পরিবারের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে অস্বীকার করা হয়েছে।এ ঘটনাটি দেশের বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষদের প্রতি বিদ্যমান বর্ণবাদের অভিযোগকে আবারও সামনে এনে দিয়েছে। শিক্ষা বা কাজের জন্য বড় শহরে গেলে তারা প্রায়ই তাদের চেহারা নিয়ে বিদ্রুপের শিকার হন, জাতীয়তা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন এবং জনসমাগমপূর্ণ স্থান ও কর্মক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হন বলে তাদের অভিযোগ।অনেকের ক্ষেত্রে এই বৈষম্য কেবল মৌখিক অপমানেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং দৈনন্দিন জীবনের নানা বাধায় রূপ নেয়, যা তাদের বসবাস ও জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষদের অনেকেই জানান, বাসা ভাড়া পেতে তাদের সমস্যার মুখে পড়তে হয়—চেহারা, খাদ্যাভ্যাস বা প্রচলিত কুসংস্কারের কারণে অনেক বাড়িওয়ালা ভাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানান।এই চাপের ফলে বড় শহরগুলোতে উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে আসা অনেক মানুষ নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় একত্রে বসবাস করতে শুরু করেন, যেখানে তারা নিরাপত্তা, পারস্পরিক সহায়তা ও নিজস্ব সংস্কৃতির পরিচিত পরিবেশ খুঁজে পান।তবে অনেকেই বলছেন, দেশের অন্য অংশে জীবন গড়ে তুলতে গিয়ে তারা প্রতিদিনের বৈষম্য সহ্য করতে শিখে নিলেও, আঞ্জেল চাকমার হত্যার মতো সহিংস অপরাধ তাদের গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। এতে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে ভয় এবং অসহায়ত্বের অনুভূতি আরও বেড়ে যায়।
গত কয়েক বছরে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী সহিংসতার বহু আলোচিত ঘটনা ভারতে ঘটেছে।২০১৪ সালে অরুণাচল প্রদেশের ২০ বছর বয়সী ছাত্র নিডো তানিয়ার হত্যাকাণ্ড জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। দিল্লিতে চেহারা নিয়ে কটূক্তির পর তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, যার ফলে দেশজুড়ে প্রতিবাদ ও বর্ণবাদ নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়।তবে অধিকারকর্মীরা বলছেন, ওই ঘটনা এমন সহিংসতার অবসান ঘটায়নি।২০১৬ সালে পুনেতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এক ২৬ বছর বয়সী ছাত্রকে মারধর করা হয়। এক বছর পর বেঙ্গালুরুতে আরেক ছাত্র তার বাড়িওয়ালার কাছ থেকে বর্ণবাদী গালাগালি ও হামলার শিকার হন।মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এ ধরনের আরও অনেক ঘটনা আছে যা জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসে না।“দুর্ভাগ্যজনকভাবে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষদের প্রতি বর্ণবাদ তখনই আলোচনায় আসে, যখন অত্যন্ত সহিংস কিছু ঘটে,” বলেন দিল্লিভিত্তিক ‘রাইটস অ্যান্ড রিস্কস অ্যানালিসিস গ্রুপ’-এর পরিচালক সুহাস চাকমা।কেন্দ্রীয় সরকার তাদের বার্ষিক অপরাধ পরিসংখ্যানে বর্ণবাদী সহিংসতার জন্য আলাদা কোনো তথ্য সংরক্ষণ করে না।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আসাম রাজ্যের বাসিন্দা আম্বিকা ফংলো, থাকেন রাজধানীতে এবং সেখানেই কাজ করেন। তিনি বলেন, আঞ্জেল চাকমার হত্যাকাণ্ড তাকে গভীরভাবে বিচলিত করেছে। আমাদের সরু চোখ আর চ্যাপ্টা নাক আমাদের সহজেই বর্ণবাদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে দেয়।ফংলো স্মরণ করেন, কয়েক বছর আগে কর্মক্ষেত্রে এক আলোচনার সময় সহকর্মীদের কাছ থেকে তিনি বর্ণবাদী নামে ডাক শুনেছিলেন। তিনি বলেন, “আপনি এসব সহ্য করেন এবং এগিয়ে যেতে শেখেন। কিন্তু সেই সঙ্গে ভারী মানসিক আঘাত বয়ে বেড়াতে হয়।”প্রতিবেশী মেঘালয় রাজ্যের বাসিন্দা মেরি ওয়াহলাং বলেন, দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে কলেজে পড়ার সময় সহপাঠীদের কাছ থেকে বারবার বর্ণবাদী গালাগালির শিকার হওয়ার পর তিনি বড় শহরে চাকরি করার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।“সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি, কেউ কেউ না বুঝেই এসব শব্দ ব্যবহার করে, আবার কেউ কেউ এর পরিণতি জেনেও করে,” তিনি বলেন।অধিকারকর্মীরা বলছেন, এসব অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন নয়।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বহু মানুষ দেশের বড় শহরগুলোর কর্মক্ষেত্র, ক্যাম্পাস ও জনসমাগমস্থলে নিয়মিতভাবেই বর্ণবাদী কটূক্তি ও দৈনন্দিন বৈষম্যের শিকার হওয়ার কথা জানান।তাদের মতে, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও সেখানকার মানুষদের প্রতি বিদ্যমান বর্ণবাদ সম্পর্কে সচেতনতা আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু তথাকথিত ‘হালকা’ বা স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া বর্ণবাদ এখনও রয়ে গেছে।
তিনি ২০১৮ সালে ভারতীয় শহরগুলোতে বর্ণবাদী সহিংসতা সংক্রান্ত অভিযোগ বৃদ্ধির পর কেন্দ্রীয় সরকারের গঠিত একটি নজরদারি কমিটির সদস্য।তিনি বিবিসিকে বলেন, এ ধরনের হামলাকে বর্ণবাদের সঙ্গে সম্পর্কহীন বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দিলে সমস্যাটি আরও গভীর হয়। সমাধানের পথে এগোতে হলে আগে সমস্যাটিকে স্বীকার ও গ্রহণ করতে হবে।
সূত্র: বিবিসি