নারী নির্যাতন, ধর্ষন, মারপিট, ছিনতাই কখনও খুনের চেষ্টা এমনকি এসিড নিক্ষেপের মত ভয়ংকর সব মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রাণীর অভিযোগ পাওয়া গেছে এক নারীর বিরুদ্ধে। এসব মামলার বেশির ভাগই আপোষ-মিমাংসা করা হয়েছে। আবার কোন মামলা তদন্ত শেষে মিথ্যা প্রমানিত হয়েছে। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ মামলায় ফাঁসিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়াই যেন তার পেশায় পরিণত হয়েছে।
ওই নারীর নাম রুবিনা পারভীন ওরফে গুলি (৫০)। খুলনার কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চৌকুনি গ্রামের ইছাক আলী সানার মেয়ে তিনি। অভিযোগ রয়েছে এ পর্যন্ত কয়েকবার বিয়ে করলেও স্বামীর সংসার করেননি। নারী নির্যাতন অথবা যৌতুক দাবীর অভিযোগ তুলে তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করেছেন কেবল। বাবার সংসারে থেকেই এসব করেন তিনি।
মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জি,এম আবুল কাসেম জানান, মামলায় ফাঁসিয়ে আপোষ-মিমাংসার নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া তার পেশায় পরিনত হয়েছে। তার মামলা থেকে বাদ পড়েননি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ি এমনকি শ্রমজীবি মানুষও। তবে তার প্রধান টার্গেট অর্থশালীরা। কখনও তিনি অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়েও মামলা করে থাকেন। অনেক সময় গ্রামের প্রভাবশালীরা নিজেদের প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে তাকে ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আদালত ও থানা সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ি, ১৯৯০ সাল থেকেই তার মামলাবাজি শুরু। বিভিন্ন সময়ে এ পর্যন্ত এসিড অপরাধ দমন আইনে ৫টি, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইনে ৭টিসহ প্রায় ৪০ টির মত মামলা করেছেন তিনি। তার করা মামলায় ব্যবসায়ি, রাজনৈতিক নেতা, ইউপি চেয়ারম্যানসহ ২ শতাধিক মানুষকে আসামী করা হয়েছে। অবশ্য স্থানীয় মানুষ জানিয়েছেন, তার করা মামলার সংখ্যা আরও বেশি।
উপজেলার কালিকাপুর গ্রামের আঃ সবুর গাজী জানান, তার ছেলে গোলাম মোস্তফাকে স্বামী পরিচয় দিয়ে নিজেকে অন্ত:স্বত্বা দাবী করে মামলা করেন। সম্মানের ভয়ে আমরা সে সময় ৫০ হাজার টাকায় তার সাথে আপোষ করে ফেলি। পরে প্রমানিত হয় কাবিনামাটি ছিল ভূয়া এবং তিনি অন্তস্বত্বাও ছিলেন না।
১৯৯৫ সালে উপজেলার ষোলহালিয়া গ্রামের শফিকুল ইসলাম নামের এক যুবককে ভূয়া কাবিনামার ফাঁদে ফেলে স্বামী দাবী করেন। পরে তার পরিবারের কাছ থেকে এক লাখ টাকা নিয়ে মিমাংসা করা হয়। এর পরের বছর মহেশ্বরীপুর গ্রামের আজিজ শেখের ছেলে আবু দাউদ শেখকে স্বামী দাবী করে একই পন্থায় তার পরিবারের ৫ সদস্যকে জড়িয়ে নারী নির্যাতন ও যৌতুক নিরোধ আইনে মামলা করেন। তারা আপোষ মিমাংসায় না আসায় পরবর্তিতে তাদের বিরুদ্ধে এসিড নিক্ষেপের অভিযোগে মামলা করেন। মামলাটি আদালতে চলমান থাকা অবস্থায় তৎকালিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও লিখিত অভিযোগ পাঠান তিনি।
আবু দাউদ শেখ বলেন, মামলার পর সে (রুবিনা) বার বার আপোষ মিমাংসার প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু আমরা মামলায় লড়তে চাইলে সে একের পর এক মামলা করতে থাকে। এক পর্যায়ে মামলায় মামলায় আমারা নিঃস্ব হতে চলি। অবশেষে তার সাথে আপোষ মিমাংসায় যেতে বাধ্য হয়েছি।
সূত্র অনযায়ি, ২০০৭ সালে মহেশ্বরীপুর ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালিন চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দীন মোল্লাকে প্রধান আসামী করে ৮ জনের নামে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করেন রুবিনা। ২০১৩ সালে মহেশ্বরীপুর গ্রামের আয়ুব আলী সানা নামের এক ব্যবসায়িকে প্রধান আসামী করে ৮ জনের বিরুদ্ধে এসিড অপরাধ দমন আইনে মামলা করেন। ২০০৯ সালে ইউপি চেয়ারম্যান শাহাবুদ্দীন মোল্লার ভাইকে প্রধান আসামী করে ৮ জনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইনে মামলা করেন। ২০১৭ সালে চৌকুনি গ্রামের চিংড়ি ঘের ব্যবসায়ি রফিকুল ইসলাম গাজীকে প্রধান আসামী করে ৫ জনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। চলতি বছরের জুলাই মাসে একই ব্যাক্তিকে প্রধান আসামী করে ৭ জনের বিরুদ্ধে একই ধারায় আরও একটি মামলা করেছেন। সর্বশেষ চলতি মাসের ১৫ তারিখে এসিড অপরাধ দমন আইনে রফিকুল ইসলামসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন।
ব্যাবসায়ি রফিকুল ইসলাম বলেন, ওই নারীর ভয়ে এলাকাবাসি সর্বক্ষন আতংকে থাকেন। না জানি কাকে কোন মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়। আমরা তাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেও মামলা থেকে রেহাই পাচ্ছি না। মামলার আলামত তৈরী করতে সে নিজের গায়ে এসিড মারতেও ভয় পায় না। তিনি জানান, এর আগে করা তিনটি মামলা তদন্তে মিথ্যা প্রমানিত হওয়ায় তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন।
মহেশ্বরীপুর এলাকার আরেক ব্যবসায়ি রবিউল ইসলাম সরদার বলেন, আমার সাথে তার কোন প্রকার শত্রুতা অথবা সম্পর্ক নেই। অথচ গত জুন মাসে আমাকে ও আমার কয়েকজন আত্মীয়কে জড়িয়ে হত্যার হুমকি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে।
একই এলাকার আরেক ব্যবসায়ি আঃ সালাম বলেন, ওই মহিলার মামলার কারনে আমার মত অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। অনেকেই জমি বিক্রি করে টাকা দিয়ে তার মামলা থেকে রেহাই পেয়েছে। তার কাছে এলাকার মানুষ এক প্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে রুবিনা পারভীন নিজেকে সমাজকর্মী দাবী করে বলেন, সমাজ সংসারে কাজ করতে গেলে মানুষ ভুল ত্রুটি করতেই পারে। কিন্তু অনেক সময় মানুষ বড় ভুল করে বসেন তখন মামলা করা ছাড়া উপায় থাকেনা। তবে একাই এত মামলা করার পিছনে অন্য কোন উদ্দেশ্য আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি সে প্রশ্নের জবাব সুকৌশলে এড়িয়ে যান।
মহেশ্বরীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিজয় কুমার সরদারকে একটি মামলার স্বাক্ষী করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমাকে কেন স্বাক্ষী করা হয়েছে জানিনা। শুনেছি ওই মহিলার সাথে এলাকার এক ব্যবসায়ির ঝামেলা হয়েছে, তাই সে মামলা করেছে। তার করা বিভিন্ন মামলা প্রসংগে জানতে চাইলে ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘ওই মহিলা সম্পর্কে এলাকাবসির বিস্তর অভিযোগ আছে।’