সোমবার, ২০ জানুয়ারী ২০২০, ০৯:৪৯ পূর্বাহ্ন




‘থানাকে জমিদার মনে করা ওসিদের জন্য এ রায় অশনিসংকেত’

নিজস্ব প্রতিবেদক :
  • প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১৯

আইসিটি মামলায় ওসি মোয়াজ্জেমের আট বছরের কারাদণ্ড হওয়ার ঘটনায় বাদী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন বলেছেন, আমি তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে পেরেছি। এটাই আমার সফলতা।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ৩ টায় আদালত প্রাঙ্গনে তিনি বলেন, বাংলাদেশের থানাগুলোতে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা নিজেদের জমিদার মনে করেন, জমিদারের মতো আচরণ করেন, তাদের জন্য এই রায় অশনিসংকেত।

রায়কে মাইলফলক আখ্যায়িত করে তিনি আরও বলেন, ওসিদের কাছ থেকে জমিদারের মতো আচরণ মানায় না।

‘রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, ওসি মোয়াজ্জেম তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। যে কারণে তাকে এই মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হয়েছে।’

তিনটি ধারায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। একটিতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করা যায়নি বলে জানান ব্যারিস্টার সুমন। তিনি বলেন, তবে রায় বিশ্লেষণ করে এ বিষয়ে আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।

একইসঙ্গে তাকে ১৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে ওসি মোয়াজ্জেমকে। জরিমানার এই টাকা নুসরাতের পরিবারকে দিতে বলা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আস-শামস জগলুল হোসেন এ রায় ঘোষণা করেন। এটি বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের হওয়া কোনো মামলার প্রথম রায়।

বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা ২০ মিনিটে বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আস-শামছ জগলুল হোসেন এজলাসে আসন গ্রহণ করেন। দুপুর ২টা ১৭ মিনিটে ওসি মোয়াজ্জেমকে কাঠগড়ায় তোলা হয়। এরপর রায় পড়া শুরু করেন আদালত।

মামলার বাদি ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন এ সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে ওসি মোয়াজ্জেমকে ঢাকার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আদালতে নেয়া হয়। ২০ নভেম্বর মামলাটিতে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে আজ রায় ঘোষণার দিন ঠিক করা হয়েছিল।

১৫ এপ্রিল সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন ঢাকার সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে এ মামলা করেন। ওইদিন ট্রাইব্যুনাল মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের নির্দেশ দেন।

১৭ জুন ওসি মোয়াজ্জেম জামিন আবেদন করলে নাকচ করেন সাইবার ট্রাইব্যুনাল। পরে তিনি ২ জুলাই হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেন। সেখানেও তার জামিন নাকচ হয়।

১৬ জুন শাহবাগ এলাকা থেকে গ্রেফতার হন মোয়াজ্জেম হোসেন। ২০ জুন সাইবার ট্রাইব্যুনালে ওসি মোয়াজ্জেমের পক্ষে কারাগারে ডিভিশন পাওয়ার বিষয়ে আবেদন করা হলে বিচারক গত ২৪ জুন তাকে প্রথম শ্রেণির বন্দির (ডিভিশন) সব সুবিধা দেয়ার নির্দেশ দেন।

উল্লেখ্য, ফেনীর সোনাগাজী থানায় মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে ‘অসম্মানজনক’ কথা বলায় এবং তার জবানবন্দির ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ এনে ১৫ এপ্রিল সাইবার ট্রাইব্যুনালে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সাইয়্যেদুল হক সুমন বাদী হয়ে এ মামলা করেন।

বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর ২৬, ২৯ ও ৩১ ধারায় করা অভিযোগটি পিটিশন মামলা হিসেবে গ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল। সেই সঙ্গে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ডিআইজি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে তদন্ত করে ৩০ এপ্রিল প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়।

২৭ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রীমা সুলতানা আদালতে প্রতিবেদন জমা দেন। একই দিন মামলার তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে একই ট্রাইব্যুনালের বিচারক সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। একই সঙ্গে ১৭ জুন গ্রেফতারি পরোয়ানা জারিসংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য করেন।

পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে বাদীসহ ১৫ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকেও নিয়মবহির্ভূতভাবে ভিকটিম নুসরাত জাহান রাফির বক্তব্যের ভিডিও ধারণ ও প্রচার করে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর ২৬, ২৯ ও ৩১ ধারায় অপরাধ করেছেন।’

প্রসঙ্গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মামলা করেন ভুক্তভোগী নুসরাতের মা। পরে সিরাজউদ্দৌলাকে গ্রেফতার করা হয়।

যৌন হয়রানির অভিযোগ করতে যাওয়ার পর সোনাগাজী থানার ওসির কক্ষে ফের হয়রানির শিকার হতে হয় নুসরাতকে। নিয়ম না মেনে জেরা করতে করতেই নুসরাতের বক্তব্য ভিডিও করেন ওসি। মৌখিক অভিযোগ নেয়ার সময় দুজন পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেলেও সেখানে নুসরাত ছাড়া অন্য কোনো নারী বা তার আইনজীবী ছিলেন না।

এর পর ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা চলাকালে নুসরাতকে পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে ডেকে ছাদে নিয়ে গায়ে আগুন দেয় নরপশুরা। ওই দিন নুসরাতকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে গত ১০ এপ্রিল চিকিৎসাধীন নুসরাতের মৃত্যু হয়।

২৪ অক্টোবর নুসরাত হত্যা মামলায় ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার দায়ে মামলার প্রধান আসামি অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাসহ ১৬ আসামির সবার ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। আসামিদের বেশিরভাগই এখন কারাগারে।

image_pdfimage_print




সংবাদটি ভাল লাগলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো সংবাদ













© All rights reserved © 2019 notunbarta24.com
Developed by notunbarta24.Com
themebazarnotunbar8765